অনলাইন ডেস্কঃ একসময় যে শহরকে বলা হতো শান্তির জনপদ, সেই খুলনার আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে আর রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছে তাজা রক্তে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে চারটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ এবং পাড়া-মহল্লায় গুলি ও ছুরিকাঘাতের মহোৎসব থেকে সুস্পষ্ট যে, এই মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারে। দিনের আলো ফুরোতেই শহরের অনেক এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে; রাতের অন্ধকারে শোনা যায় গুলির শব্দ, ককটেলের বিস্ফোরণ কিংবা মরণচিৎকার। 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, এই সহিংসতার কারণ, খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকার সংঘটিত অপরাধচক্রের, বিশেষ করে সাতটি সন্ত্রাসী বাহিনীর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, মাদক সিন্ডিকেট, অবৈধ অস্ত্রের কারবারÑ এই তিনের সমন্বয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর অপরাধ কাঠামো, যার বিস্তার ঘটেছে খুলনাজুড়ে।

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনানুষ্ঠানিক হিসাব মতে, গত দেড় বছরে খুলনা মহানগর ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে অন্তত ৬০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব হত্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা।

সবশেষ আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটে গত বুধবার (৪ মার্চ) রাতে খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলা মোড়ে। প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাত প্রায় ৯টার দিকে একটি সংঘবদ্ধ দল বাটা শোরুমের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা মাসুম বিল্লাহকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর তারা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। ঘটনার সময় দায়িত্বরত এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের সহায়তায় সন্দেহভাজন শুটার অশোক ঘোষকে পিস্তলসহ আটক করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর শহরে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। এর আগে রবিবার (১ মার্চ) নিরালা মোড়ে আব্দুল আজিজ নামে এক যুবককে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীর আধিপত্যের লড়াইয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, খুলনা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় সাতটি বড় সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। এই বাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো গ্রেনেড বাবু বাহিনী, পলাশ বাহিনী, অশোক গ্রুপ, বাবু-সোহেল সিন্ডিকেট, কিশোর গ্যাং ‘বি কোম্পানি’, রোহা গ্রুপ এবং কয়েকটি ছোট অস্ত্রধারী দল। প্রতিটি বাহিনীর নিজস্ব এলাকা, শুটার ও মাদক সরবরাহ নেটওয়ার্ক রয়েছে। 

গোয়েন্দা তথ্যে নগরীর বস্তিগুলোর এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তথ্যমতে, খুলনার অর্ধশতাধিক বস্তিতে অন্তত শতাধিক প্রশিক্ষিত শুটার অবস্থান করছে। প্রতিটি বস্তিতে গড়ে দুজন করে শুটার এবং চারজন করে দুর্ধর্ষ নারী মাদক বিক্রেতা রয়েছে। এই কিশোর গ্যাং ও শুটার বাহিনীগুলোকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যবহার করছে প্রভাবশালীরা। বিশেষ করে, রোহা ও বি কোম্পানির মতো কিশোর গ্যাংগুলো এখন বড় বড় হত্যাকাণ্ডে প্রধান ভূমিকা রাখছে। 

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) ডিসি সাউথ তাজুল ইসলাম জানান, খুলনা একসময় চরমপন্থীদের ঘাঁটি ছিল। বর্তমানে কেএমপি এলাকার বাইরে ডুমুরিয়া, ফুলতলা, তেরখাদা ও দিঘলিয়ায় চরমপন্থীদের তৎপরতা আবার বাড়ছে। কয়রা, পাইকগাছা ও মোংলা অঞ্চলে সক্রিয় বনদস্যুদের সঙ্গে এই চরমপন্থী ও ভাড়াটে খুনিদের গোপন সমঝোতা তৈরি হয়েছে। যার ভিত্তিতে তারা অপরাধ সংঘটিত করছে।

খুলনা শহরের অর্ধশতাধিক বস্তিতে এখন সংঘটিত অপরাধের গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এসব বস্তিতে প্রায় শতাধিক শুটার অবস্থান করছে। প্রতিটি বস্তিতে গড়ে দুজন করে অস্ত্রধারী এবং কয়েকজন করে মাদক বিক্রেতা রয়েছে। এই শুটাররা মূলত বিভিন্ন বাহিনীর হয়ে কাজ করে এবং নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে অংশ নেয়। একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খুলনায় ভাড়াটে খুনির একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। অনেক তরুণ দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে এসব বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, খুলনার অপরাধ পরিস্থিতি বোঝার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণÑ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, মাদক সিন্ডিকেট ও অস্ত্রবাজি। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার লড়াই অনেক সময় সংঘর্ষের জন্ম দেয়। নির্বাচনের সময় বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এসব সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ করলে আইনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমে। দ্বিতীয়ত, মাদক ব্যবসা এখন বড় অর্থনৈতিক উৎসে পরিণত হয়েছে। মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব হচ্ছে। তৃতীয়ত, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা অপরাধকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও নদীপথ ব্যবহার করে এসব অস্ত্র শহরে প্রবেশ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একজন অপরাধ বিশ্লেষকের ভাষায়, এই তিনটি উপাদান একত্রে কাজ করলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। খুলনায় এখন সেই ত্রিভুজ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অপরাধও ঘটছে। খালিশপুর এলাকায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোনাডাঙ্গায় এক বৃদ্ধ কবিরাজকে হাত-পা বেঁধে তার ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা সবাইকে বিস্মিত করেছে। ডুমুরিয়ায় এক ইজিবাইক চালককে মারধর করে গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ অপরাধ বিস্তারের ফলে সংঘবদ্ধ বাহিনী যেমন ভয়ানক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর অধিকাংশের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অপরাধ দমনে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সহকারী পুলিশ কমিশনার, কেএমপি ত. ম. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চলছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ করছি।’

তবে সমালোচকরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধের পেছনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভাঙতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তানভীর আহমেদ সোহেল বলেন, ‘যখন তরুণদের সামনে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকে এবং অপরাধ করে দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়, তখন তারা সহজেই এসব চক্রে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পুলিশি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সামাজিক সচেতনতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।’

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘খুলনার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে। নগরীর রাস্তাঘাট যেন সন্ত্রাসীদের জন্য অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুলনা মহানগর ও জেলাকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, অবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক সিন্ডিকেট ভাঙা এবং সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।’

একসময় শান্তি ও সহাবস্থানের জন্য সুপরিচিত ছিল খুলনা। কিন্তু এখন সেই শহর ক্রমেই সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। অপরাধচক্র, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও মাদক অর্থনীতির জটিল সমীকরণ ভাঙতে না পারলে খুলনার এই রক্তাক্ত বাস্তবতা থেকে বের হওয়া সহজ হবে না। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *